দুষ্প্রাপ্য ধাতু ও প্রযুক্তিপণ্য রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ

মার্কিন জ্বালানি ও কৃষি সরঞ্জামে চীনের পাল্টা শুল্ক

মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যে শুল্ক স্থগিত ট্রাম্পের

হোয়াইট হাউজে প্রবেশের দুই সপ্তাহের মধ্যে নির্বাহী আদেশে চীনা পণ্য আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর দুইদিনের মধ্যে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন পণ্যে একই বাধা আরোপ করল বেইজিং।

হোয়াইট হাউজে প্রবেশের দুই সপ্তাহের মধ্যে নির্বাহী আদেশে চীনা পণ্য আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর দুইদিনের মধ্যে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন পণ্যে একই বাধা আরোপ করল বেইজিং। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও কৃষি সরঞ্জামের ওপর বসছে শুল্ক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেক জায়ান্ট গুগলের বিরুদ্ধে অ্যান্টিট্রাস্ট তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। অবশ্য একই সময়ে দুই প্রতিবেশী মেক্সিকো ও কানাডার ওপর আরোপিত শুল্ক ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর এফটি।

চীনা অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কহার ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে। এটি ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। দেশটি আরো জানিয়েছে, তারা মার্কিন গাড়ি আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করবে। এছাড়া দেশটিতে দুষ্প্রাপ্য ধাতু রফতানি নিয়ন্ত্রণ করবে।

গতকাল মধ্যরাতে চীনা পণ্যে নতুন মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যে বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, নতুন করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে সেটির দ্বিতীয় ধাপের সূচনা হলো।

গত সপ্তাহান্তে কানাডা, মেক্সিকো ও চীনা পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের ঢল ঠেকাতে এবং মাদকজাতীয় দ্রব্য ফেন্টানিল ও এর কাঁচামালের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে গত সোমবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবামের সঙ্গে আলোচনার পর দেশ দুটির ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকদিনের মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে শুল্ক আরোপের বিষয়টি সমঝোতার দিকে গড়াতে পারে।

মার্কিন-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক পুঁজি, মুদ্রা ও জ্বালানি তেলের বাজারে। হংকংয়ের হ্যাং সাং সূচক গতকাল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তবে মার্কিন শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর কমে ১ দশমিক ৮ শতাংশে স্থির হয়। একই দিনে অফশোর রেনমিনবির বিনিময় হার ডলারের বিপরীতে দশমিক ১ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ৩২ রেনমিনবিতে নেমে যায়।

এদিকে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ চীনের। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে কোনোভাবেই সহায়ক নয়, বরং এর মাধ্যমে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, মার্কিন কয়লা ও এলএনজি আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। এছাড়া অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, কৃষি যন্ত্রপাতি, বড় গাড়ি ও পিকআপ ট্রাকের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

চীনের অ্যান্টিট্রাস্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা গতকাল গুগলের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের সন্দেহ, প্রতিষ্ঠানটি একচেটিয়া ব্যবসাবিরোধী আইন লঙ্ঘন করেছে।

গুগলের সার্চ ইঞ্জিন চীনে নিষিদ্ধ। কোম্পানিটির প্যারেন্ট প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের বেশির ভাগ ব্যবসাও দেশটিতে সীমিত আকারে পরিচালিত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ টেক জায়ান্ট চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দেয়া বিজ্ঞাপন থেকে মুনাফা করে। এছাড়া চীনা স্মার্টফোন নির্মাতারা ব্যাপকভাবে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা টাংস্টেনসহ ২৫ ধরনের দুষ্প্রাপ্য ধাতু ও প্রযুক্তিপণ্য রফতানির ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এ পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

এছাড়া মার্কিন পোশাক প্রস্তুতকারক পিভিএইচ গ্রুপের মালিকানাধীন ব্র্যান্ড ক্যালভিন ক্লেইন ও টমি হিলফিগার এখন থেকে চীনে ‘অনির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে ব্র্যান্ড দুটি চীনের জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কালো তালিকায় প্রবেশ করল। এ তালিকার উদ্দেশ্য হলো দেশটির সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থ সুরক্ষা।

চীন বলছে, জিনজিয়াং অঞ্চলের তুলা শিল্পের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে পিভিএইচ। এ বিষয়ে তদন্তের পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যদিও জিনজিয়াং অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সংখ্যালঘুদের জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে খোদ চীনের বিরুদ্ধে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক প্রতিষ্ঠান ইলুমিনাও কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, সামনের দিনগুলোয় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ দুটির মধ্যে একটি বাণিজ্যিক সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ এ বিষয়ে সন্দিহান। আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলির এশিয়া বিষয়ে প্রধান অর্থনীতিবিদ রবিন জিং বলেন, ‘শুল্ক এড়ানোর জন্য কোনো চুক্তির সম্ভাবনা সীমিত বলে মনে হচ্ছে। বাণিজ্য উত্তেজনা কমানোর পথ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। উভয় পক্ষ উল্লেখযোগ্য ছাড় না দিলে কোনো সমাধান সম্ভব নয়।’

গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে সর্বজনীন আমদানি শুল্কের ঘোষণা দিয়ে বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা ছড়ান ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য চীনের সঙ্গে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ চলে আসছে। নির্বাচনে জেতার পর ট্রাম্প শুল্কবাধার বিষয়টি পুনরাবৃত্তি করলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছিলেন, এ ধরনের যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হয় না।

আরও